শীত এলে এই শহরটা হয়ে যায় কবির মতো। তখন তার ধোঁয়াশা মেশানো কুয়াশা ঘোলা চোখে কবির উদাসী দৃষ্টি। হিমের পরশে পাতা ঝরতে থাকা শহরের গাছ গাছালি মাথা তুলে থাকে উসকো খুশকো চুলের মতো। শীতের মিঠে রোদের আলোয়ান গায়ে চাপিয়ে, পথের ধুলো মেখে শহরটা তখন সে এ-মাঠে সে-মাঠে ঘুরে বেড়ায়। আর তারপর মনের মতো মাঠ খুঁজে পেলে কবি তার ঝোলা থেকে বের করে বই। অক্ষরের বন্ধনে কাছে টানতে চায় বইপ্রেমী মানুষকে। তার চোখের সামনে মেলে ধরে বই—মেলা বই… বইমেলা…।
সংখ্যার হিসেবে যা-ই হোক না কেন, ‘কবির বয়স’ কিন্ত বাড়ে না। কবি সকলের একবয়সি জেনো। বইমেলারও তাই। যদিও এবছর সে আটচল্লিশে পড়ল, তবুও আট থেকে আশী সকলের সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব। তাইতো বই মেলার টানে শেষ শীতের ক’টা দিন বয়স নির্বিশেষে বহু মানুষ পায়ে পায়ে হাটে। নাহ্, এখন বইমেলায় প্রান্ত শীতের শিশিরভেজা ঘাসে ঘাসে আর ফেলতে হয় না বললেই চলে। এখন পায়ের তলায় কংক্রিট। বইমেলা আজ ধুলোহীন। কিন্তু বইমেলায় স্মৃতির ধুলোর সোঁদা গন্ধ? সে তো আজও আটকে রয়েছে আমাদের চেতনায়। আজও বইমেলায় ঢুকলে তা আজও আবিষ্ট করে দেয়! এই প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সে এসে বইমেলা আজও স্মৃতির ধুলো হাতড়ে খুঁজে ফেরে রত্নকণা। এই সময়টায় প্রৌঢ়ত্বে পা রাখতে চলা বইমেলার পেছনে নস্ট্যালিজিয়ার শিকড়টান, আর সামনে এগোনোর অভিযান। এই বয়সটায় পৌঁছে বইমেলা দু’য়ের মধ্যে ব্যালান্স করে চলে, অতীতের অভিজ্ঞতা নিয়ে আধুনিকতাকে আত্তীকরণ করে। প্রায় পঞ্চাশে পৌঁছনো প্রৌঢ়ত্বের এটাই তো ধর্ম, একদিকে প্রাজ্ঞতা, অন্যদিকে প্রগতি। এটাই আটচল্লিশতম বইমেলার ইউএসপি।

এতগুলো বছরে বইমেলার প্রাপ্তিও বড় কম নয়। লন্ডন আর ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পরেই তৃতীয় বৃহত্তম স্থানে রয়েছে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলাকে অনুসরণ করে এই কোলকাতা শহরে প্রথম কলকাতা বইমেলা শুরু হয় 1976 সালে। অবশ্য ইতিহাস বলে অন্য কথা।রূপ নারায়ণ বথাম এবং নিমিশা কেশরওয়ানির গবেষণাপত্র থেকে জানা গিয়েছে দেশের প্রথম বইমেলার হয়েছিল 1918 সালে, কলেজস্ট্রিটে। প্রকাশনা শিল্পের আত্মপ্রকাশের সময়ে। 1906 সালে, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরের বছরে স্থাপিত ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন (এনসিই) –এর উদ্যোগে। একে অবশ্য বইমেলা না বলে প্রকাশিত বইয়ের প্রদর্শনী বলাই ভালো। তবে সেই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালা লাজপত রায়, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পালের মতো ব্যক্তিত্বরা। এরপর 1970 সালে একদল বুদ্ধিজীবী এবং প্রকাশক বিমল ধর ও প্রবীর দাশগুপ্ত কলেজস্ট্রিটের কফি আড্ডায় বসে আলোচনা করতে লাগলেন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার অনুকরণে এই শহরেও বইমেলার আয়োজন করলে কেমন হয়! 1975 সালে গঠন করা হল ‘দ্য পাবলিসার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’ সংস্থাটি, কলকাতায় বইমেলার আয়োজন করার জন্য। সংস্থার সদস্যরা চেয়েছিলেন কলকাতার বইপ্রেমীদের সঙ্গে সরাসরি ভাবনার আদানপ্রদান করতে। সেইমতো 1976 সালে 34 জন প্রকাশক আর 56 টা স্টল নিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের উল্টোদিকে শুরু হল পুস্তকমেলা। সেই মেলায় প্রবেশমূল্য ছিল পঞ্চাশ পয়সা। বলা যেতে পারে, এই বইমেলার মাধ্যমেই মুক্ত বাণিজ্যনীতি প্রথম বাস্তবায়িত হয় এই শহরে। বই বিপণীর চার দেওয়াল ছাড়িয়ে বইয়ের ব্যবসার মুক্তাঞ্চল ছড়িয়ে যায় বইমেলার মাঠে।
এতগুলো বছরে কলকাতা বইমেলা কতবার ঠাঁইনাড়া হয়েছে। ময়দান, পার্ক স্ট্রিট, রবীন্দ্রসদনের উল্টোদিকের মাঠ, বাইপাশের মিলনমেলা প্রাঙ্গন ইত্যাদি থেকে এতদিনে কলকাতা বইমেলার স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে সল্টলেকের করুণাময়ীর সেন্ট্রাল পার্কের বড় মাঠটা। বুড়ো হতে চলল বইমেলা, আর কতই বা জায়গা বদল করবে? এবারের বইমেলায় কুড়িটা দেশ অংশ নিচ্ছে, থাকছে 1050 টা স্টল। বইমেলার এই আটচল্লিশ বছরের সময়সীমায় এবারই প্রথম ফোকাল থিম কান্ট্রি হিসেবে থাকছে জার্মানি। কলকাতা বইমেলার সঙ্গে বিশেষ যোগ ছিল জার্মানির। 1982 সালে এই জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ডিরেক্টর পিটার উইদার্স কলকাতা বইমেলা পরিদর্শনে আসেন। তাঁরই সুপারিশে পরের বছরই 1983 সালে কলকাতা বইমেলা ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা পায়।

আটচল্লিশতম বইমেলার থিম প্যাভেলিয়নটির সোপানাকারের স্থাপত্য বিস্ময় জাগাবে থাকছে। যার কারিগর এক বাঙালিনী। প্যাভেলিয়নে থাকছে জার্মান সাহিত্য, বই, ভিডিও ইত্যাদি। জার্মান সাহিত্যিক গ্যোয়েটে এবং জার্মান ভাষাবিদ ম্যাক্সমূলারের নামে দুটো গেটও থাকছে এবারের বইমেলায়। ভারতে দায়িত্বপ্রাপ্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. ফিলিপ আকারম্যান, গ্যোয়েটে ইনস্টিটিউট (সাউথ এশিয়া)-এর কর্মকর্তা ড. মার্লা স্টুকেনবের্গ বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যেপাধ্যায়ের সঙ্গে। একসময় ধুলোর দূষণের কারণে বইমেলায় অংশ নেওয়া থেকে দূরে ছিল জার্মানি।
এখন অবশ্য বইমেলা ধুলোর দূষণ অনেক কম, বইমলা এখন অনেক আধুনিক। বইমেলার কোন স্টল কোথায় রয়েছে তার খুঁজে বের করার জন্য এবছর তৈরি করা হয়েছে আইকেবিএফ নামে অ্যাপটি। যা মোবাইলে ডাউনলোড করতে পারলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে নির্দিষ্ট বইয়ের স্টলে। এবছর ইংরেজি বইয়ের স্টলগুলিকেও নিয়ে আসা হচ্ছে মুক্ত পরিসরে। ফলে বইমেলার চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জাযগা মিলছে। বইমেলার জন্য সরকারি বাস এবং ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর সংখ্যা অনেক বাড়ানো হয়েছে। বইমেলার জন্য শিয়ালদহ থেকে সেক্টর ফাইভ পর্যন্ত ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর সংখ্যা 106 থেকে বাড়িয়ে 122 করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে অন্তিম মেট্রোর সময়কাল, কমানো হয়েছে দুটি মেট্রোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান। মোট কথা বইমেলায় পৌঁছনো, ঘোরা, স্টল খোঁজা এখন আগের তুলনায় অনেক অনায়াস।
তবুও পুরনো বইমেলার নস্ট্যলজিয়া যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। সেই বইমেলার পরে ডাস্ট এলার্জিতে জেরবার হওয়া। গেটের মুখে বইমেলার ছাপানো ম্যাপ নিয়ে স্টল নম্বর ধরে গন্তব্য খুঁজে পেতে গোলোকধাঁধায় ঘুরে মরা। বইমেলা পোস্টার আঁটা বাসের জন্য হাপিত্যেশ করে কোনওরকমে লাফিয়ে পাদানিতে ওঠা। এইসব কৃচ্ছসাধনের পরে বইমেলায় পৌঁছনোটা ছিল তীর্থযাত্রার মতো, শহরের চতুর্দশ পার্বণে বই-তীর্থ দর্শনের মতো। আসলে বইমেলার মতো আমাদেরও বয়স বাড়ছে। যুগের দাবিতে আরামের অভ্যেস আমাদের এখন অনেকটা অক্ষম করে তুলেছে।
তাই বইমেলার অনর্গল ভিড়ে ক্লান্তিহীন পথ হাঁটায় এখন আমাদের অনভ্যাস জন্মেছে। এই অশক্ততা বেড়েছে বইমেলারও। অনেক সমালোচক বলছেন বইমেলা বেশ কিছুদিন ধরেই পথ গিল্ডের হাত ছাড়াও পথ হাঁটার জন্য রাজনৈতিক যষ্ঠির ওপর ভর দিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বইমেলা অনেকটা রাজপ্রসাদ লাভ করেছে। বইয়ের ব্যবসা এখন শিল্পের গোত্রভুক্ত হয়ে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু তবুও বইমেলায় রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ ঘটেছে, একথা মানতে নারাজ গিল্ড কর্তারা। এই তো এবছরই রাজনৈতিক ব্যানারে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বইমেলায় স্টল চাইলে, তাতে বাধা দেন গিল্ড কর্তারা। বিষয়টা গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্ত। আদালত রায় দিয়েছিল গিল্ড কর্তাদের পক্ষেই। শেষ পর্যন্ত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নামে রাজনৈতিক দল নয়, তাদের মুখপত্র ‘বিশ্ব হিন্দু বার্তা’র নামে আবেদন পত্রের ভিত্তিতে স্টল দেওয়া হয়, যেমন দেওয়া হয়ে থাকে গণশক্তি, জাগো বাংলার স্টলকে। অন্যদিকে স্টল দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি এপিডিআরকে। এটাই বইমেলার ভাবনায় প্রাপ্তমনস্কতা, সিদ্ধান্তে ঋজুতা। আটচল্লিশ বছরে বইমেলা শুধু আধুনিকই হয়নি, হয়েছে অভিজ্ঞও – এটাই তার প্রমাণ।

অতিমারির কাল ছাড়া বইমেলা যাত্রা থামেনি কখনও। চরাচর ভেঙে বইমেলায় প্রতিবছর এগিয়ে চলেছে মানুষের স্রোত। তবে যু্গের পলি জমে সেই স্রোত কখন যেন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। দ্বিধা বিভক্ত হয়ে গিয়েছে মেলামুখো মানুষেরা। তাদের মধ্যে এক দলের কাছে এটা বইয়েরই মেলা, অন্য দলের কাছেটা মেলা বৈ আর কিছুই নয়। বলা বাহুল্য, প্রথম শ্রেণিভুক্তরা হয়তো বা সংখ্যালঘু। তবু তাঁরা দীর্ঘ শ্বাস নিতে নিতে, শ্লথ পায়ে আসেন পছন্দের বইয়ের স্টলে। সাধ আর সাধ্যের মধ্যে বিস্তর হিসেব কষে বই কেনেন বইমেলায়। ডিসকাউন্টের কমবেশির তোয়াক্কা না করে। বই কেনার ফাঁকে সময় খুঁজে নিয়ে বইমেলার ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেরি ফেস্টিভ্যালের অডিটোরিয়ামে গিয়ে বসেন। মনের দূরবীনে চোখ রেখে স্মৃতি হাতড়ে ফিরে যান পুরনো দিনের বইমেলার সেই সব সাহিত্যিকদের আড্ডার দিনগুলোতে।
সেই আড্ডার চেহারাটা ছিল বিলকুল অন্যরকম। কোন সাহিত্যিক কোন বইমেলায় কোন স্থলে থাকবেন তারা আগাম খবর নিয়ে এসে সাহিত্যিকদের মুখোমুখি হওয়াটা ছিল বইমেলার অমোঘ আকর্ষণ। তখন বইমেলায় কয়েকজন লেখক সাহিত্যিক এমনকী জনাকয়েক সমঝদার পাঠক আর লেখক জড়ো হলেই আড্ডা জমে যেত। স্টলের বাইরে দু’চারটে সাহিত্যিকদের চেয়ার নিয়ে বৃত্ত তৈরি হত। তারপর সেই বৃত্তের পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকত বইমেলা জুড়ে। যেখানে দেখা যেত বুদ্ধদেব বসুকে মাটির ভাঁড়ের চায়ে চমুক দিতে। তারপর মেলার শেষে আড্ডায় টপ্পাকে সবাইকে মাতিয়ে দিতে। পূর্ণেন্দু পত্রিকায় দেখা যেত হাতে গরম ছবি এঁকে নিজের হাতে বিক্রি করতে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায়কে দেখা যেত ‘কৃত্তিবাস’ –এর আড্ডায় চিৎকার করে কবিতার পিঠে কবিতা চাপিয়ে মাতাল হয়ে উঠতে। সুচিত্রা ভট্টাচার্যকে দেখা যেত অটোগ্রাফ শিকারীদের হাতে ধরা পড়ে শেষ পর্যন্ত পুলিশের সাহায্য নিয়ে উদ্ধার হতে। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত লেখককে দেখা গিয়েছে মেলায় ‘বই-চোর’ ধরা পড়ার পরে বইপ্রেমী চোরের বইয়ের দাম চুকিয়ে দিতে। পাজামা পাঞ্জাবি পরা সত্যজিত্ রায়কে বইমেলায় একলা হতে, ঋত্বিক ঘটককে সুরাতাড়িত হয়ে বইমেলায় বইয়ের গন্ধে চুর হতে। 1997 সালে বইমেলায় যেবার বইমেলায় আগুন লেগে অন্তত এক লক্ষ বই পুড়ে গিয়েছিল – সেদিন বইয়ের চিতা ভস্মের সামনে দাঁড়িয়ে কত মানুষ হাপুস নয়নে কেঁদেছিল, সেইসব কথা, ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা আজও বইমেলার অ্যালবামে ধরা রয়েছে। পরে তখনকার সংস্কৃতিমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উদ্যোগে সরকারি অনুদানে ফের বইমেলা প্রাণ পায ফিনিক্স পাখির মতো। বইমেলায় প্রাণ হারান একজন, পোড়া বই নিলামও হয়েছিল। আসলে লেখক পাঠকের একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কত মুহূর্ত জমাট বেঁধে থাকত বইমেলার ধুলো-কাদায়! তখনও যে বইমেলা আজকের মতো কর্পোরেট চেহারা নেয়নি।

আর এখনকার বইমেলায় লেখক-পাঠকের আড্ডাটা নাম বদলে হয়েছে ‘অথর্স কর্নার’। যা এখন বইমেলার কোন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মঞ্চে ওঠার আগে মিটিং পয়েন্ট। সেখানে অটোগ্রাফ নিয়ে সাহিত্যিকদের হস্তরেখার শেষ টান অথবা ফুটকির জন্য অপেক্ষার নিজস্বতা থাকে না।শুধু কৃত্রিম হাসি মুখে ফুটিয়ে মোবাইলের সেলফি নিলেই কম্মো সারা। বইমেলা এখন যতটুকু সাহিত্যিকদের চরণপাতে ধন্য হয় নেহাতই কেজো প্রয়োজনে। সেই সময়কার বহু সাহিত্যিক আজ আর নেই। যাঁরা রয়েছেন, সেই প্রফুল্ল রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, শংকরের মতো অশীতিপর সাহিত্যিকদের চরণপাতে বইমেলা ধন্য হলে আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করি। কবি-সাহিত্যিকরা এখন বইমেলায় আসেন শুধুমাত্র গিল্ডের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে কিংবা বইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ উপলক্ষে। অতিথি মঞ্চে সেলোফোনে মোড়া পুষ্পস্তবক নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের সামনে আলগা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখা ছাড়া তাঁদের তেমন কোন ভূমিকা থাকে কি?
হয়তো বা লেখক পাঠকের মধ্যে সম্পর্কের সুতোটাই যেন আলগা হয়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে খানিকটা রাশ ধরে রেখেছেন জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, শ্রীজাত, তিলোত্তমা মজুমদার, যশোধরা রায় চৌধুরী, দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের মতো কবি-সাহিত্যিকরা। এখনও তাঁরা বইমেলায় কিছু স্টলে এসে খানিক সময় কাটান। আলাপচারিতা করেন পাঠকদের সঙ্গে। স্টলে বসে সই করে দেন বইতে প্রথামতো। তাতে আলাপ হয়, বন্দিশ তৈরি হয় না।
এই সূত্রেই প্রশ্ন ওঠে, বইমেলায় আসা দর্শকদের সংখ্যা কি কমছে? কমছে সিরিয়াস পাঠকের সংখ্যা? পরিসংখ্যান কিন্তু বলছে উল্টো কথা। গিল্ডের সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন বইয়ের বিক্রি বাড়ছে বইমেলায়। গিল্ডের হিসেব অনুযায়ী গত বছর বইমেলায় এসেছিলেন 27 লক্ষ মানুষ। উদ্বোধনী দিনে মুখ্যমন্ত্রীর আশা সংখ্যাটা এবার কোটিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। বইয়ের বিক্রি বাড়তে পারে গতবারের চেয়ে (23 কোটি) বেশি। গিল্ডের সভাপতি সুধাংশু দে বলছেন, বইমেলায় ফুটফল বাড়ছে, বইয়ের স্টলের জন্য আবেদনের সংখ্যা বাড়ছে। বইপাড়ার মতো বেশি ডিসকাউন্ট না দেওয়া হলেও বিক্রি বেড়েছে। বেড়েছে স্টলের সংখ্যা।

তবে বইয়ের স্টল বাড়লেও বইয়ের বিক্রি বাড়ছে কিনা সেই গাণিতিক সমাধান জানা না গেলেও বইমেলার ফুড কোর্টে কিন্তু উপচে পড়া থাকে রোজই। অনেক বেশি দাম দিয়ে খাবারের প্যাকেট কিনছেন মানুষ। মেলার খাবার স্টলগুলির বাণিজ্য ভালোই হচ্ছে।
বইমেলা কিন্তু প্রচারেরও একটা বড় মাধ্যম। ছিল প্রতিবাদ জানানোর প্ল্যাফর্মও। একসময় লিটল ম্যাগাজিনের স্টলগুলি ছিল সাহিত্যের কুঁড়ি ফোটানোর একটা নার্সারি। কত উঠতি কবি সাহিত্যিক বইমেলার এই লিটল ম্যাগাজিন থেকে তাদের জীবনের প্রথম সূর্যোদয় দেখেছে। লিটল ম্যাগাজিনের স্টলগুলোর মাথার ওপর পাকা ছাদ তখন ছিল না। তার মধ্যেও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, নবারুণ ভট্টাচার্য, সুবিমল মিত্র, উদয়ন গোস্বামীর মতো কতজন লিটল ম্যাগাজিনের হয়ে গলা ফাটিয়েছেন। মাথায় পাকা ছাদ হলেও বইমেলায় এখনও দুয়োরানি লিটল ম্যাগাজিন। এই প্রজম্নের ছেলেমেয়েরা কমই ভিড় জমায় সেখানে।
বইমেলায় এই প্রজন্মের যারা ভিড় করে, তারা গ্লোসাইনের ঝলকানির মধ্যে দিয়ে তারা হেঁটে যায়। আঁতেল পোশাকে বা ঝলমলে পোশাক নিজেদের স্টেট্যাস দেয়। ঘনঘন মোবাইলে ফোন করে সঙ্গী অথবা সঙ্গীনীদের। অভিমান-অনুয়োগ শোনা যায়। বইমেলা তাদের কাছে মিটিং পয়েন্ট। অথচ বইমেলাকে আধুনিক প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় গড়ে তুলতে এই মোবাইল প্রযুক্তিকেই ব্যবহার করা হয়েছে তাদের অ্যান্ড্রয়েড ফোনের হ্যান্ডসেটেই পাওয়া যাচ্ছে বইমেলার যাবতীয় খবর থাকছে নানার হালহদিশ। তবু ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, ই-বুকে অভ্যস্ত প্রজন্ম তেমন করে নেশাগ্রস্ত হয়নি বইমেলার ধুলো-মাখা নতুন বইয়ের কাছে।
বইয়ের পাতায় লিপির সঙ্গে তুলিরও যোগাযোগ থাকে। সেই ভাবনা থেকেই বইমেলায় ছবি-কার্টুন আঁকার রেওয়াজ। পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু পত্রীর মতো কত বিশিষ্ট মানুষ বইমেলার মাটিতে বসে ছবি এঁকেছেন। নিজের হাতে বিক্রি করেছেন। ছবি আঁকা এবং আঁকা ছবি নিয়ে আলোচনার জন্য পূর্বতন সরকারের আমলে রাখা হয়েছিল মঞ্চ— মঁমার্ত। যা আসলে ফরাসী দেশের মঁমার্তের একটা অক্ষম অনুকরণ মাত্র। তা না হলে সেখানে গ্রামের পটুয়া, পটশিল্পী, এমনকী আর্ট কলেজ থেকে সদ্য পাশ করা লাইভ পোট্রের্ট আঁকা শিক্ষানবীশ আর্টিস্টদের মঁমার্তে জায়গা হয় না কেন? আসলে বইমেলায় ছবি দেখার সময় নেই, ছবি বোঝার সমঝদার নেই। তার চেয়ে বরং গানটা বইমেলায় ভালো জমে।

এখন বইমেলায় কান ঝালাপালা করে দেয় গানের ফিউশান। লোকসঙ্গীত, বাংলা রক কিংবা বাংলা ব্যান্ড, রবীন্দ্রসঙ্গীত, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সব সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। কখনও কখনও বইমেলার মাঠে বাংলা রকের উচ্চকিত নির্ঘোষের মধ্যে চাপা পড়ে যায় পাশের মাঠে গিটারে আর ডুবকিতে তাল দিয়ে নরম গলায় গাওয়া গান ‘আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে’ কিংবা দূর থেকে ভেসে আসা শিবকুমার শর্মার পাহাড়ি রাগের ধুন। সব শুনে গুলিয়ে যায় সবকিছু।
এরই মধ্যে কোনও সংবাদমাধ্যমের স্টলে রিয়েলিটি শো এর আদলে ক্যুইজের আসর। সেখানে গানের সঙ্গে ভিডিও, কোমর দুলছে মেলার আগন্তুকদের। শব্দে চাপা পড়ে যাচ্ছে মেলা থিম সং-এর কথাগুলো। আসলে কিছু মানুষের কাছে বইমেলা এখনও বিনোদন। মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা—এই বইমেলারই একটি স্টলের সামনে প্রথম শোনা গিয়েছিল গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বিখ্যাত মহীনের ঘোড়াগুলির গান। …পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে…। বহুল পরিচিত এই ব্যান্ডের গানটি মেলার মাঠে জন্ম নিয়েছিল। সেবার মেলা শেষে বহু বইপ্রেমী মানুষের মধ্যে গুণগুণ করে গাইতে গাইতে পথে ছিল। এভাবেই তাদের পৃথিবীটা বড় হয়ে গিয়েছিল।
অনেকেই বলছেন আধুনিক প্রজন্ম এখন ই-বুক পড়তেই বেশি অভ্যস্ত। তাই বই হাতে নেড়ে চেড়ে দেখার কী যে আনন্দ- তা উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত। কত ফেলে আসা স্মৃতি যে আমাদের হৃদয় থেকে হারিয়ে গেলেও বইয়ের বুকে রয়ে যায়, তা জানার সুযোগই হয়তো হবে না এই প্রজন্মের। এই তো সেদিন, বইয়ের তাক থেকে পুরনো বই খুঁজতে গিয়ে বইমেলা থেকে সোমার্কর উপহার দেওয়া ‘পাগলী তোমার জন্য’ বইটা হাতে এল। প্রথম পাতায় লেখা ছিল – ‘…এক মুঠো মাটি আর এক টুকরো মেঘ তোর পড়ার টেবিলে রেখে এলাম। দ্যাখ্, বৃষ্টি সরাতে পারিস কিনা…’ । সোমার্ক আজ কত দূরে! কিন্ত ওইটা বইটা পাওয়ামাত্র তুমুল বৃষ্টি এলো হৃদয় জুড়ে। ঝোড়ো বাতাস এলোমেলো করে দিল। বইমেলার শিশির ভেজা মাঠে প্রাক বসন্তের খসখসে বাতাসও আজও হয়তো এমন বাদলা বাতাস বয়ে বেড়ায় চুপি চুপি। তা জানতে হলে কান পাত্তা হয় স্মৃতি নিভৃতিতে ডুব দিতে হয়।\

বইমেলাতে প্রেমও আসে নিঃশব্দ চরণে। বইয়ের পাঁজার ফাঁক দিয়ে, বইমেলার ভিড়ের ফোকর দিয়ে। আর প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর দিনটা সাধারণত এই বইমেলার মধ্যেই প়ড়ে। তখন বইমেলার মাঠেই জমে ওঠে প্রেম। আচ্ছা, সেসব বুঝেই কি এবার আটচল্লিশতম বইমেলার ম্যাসকট সরস্বতীর বাহন হাঁস দম্পতিকে আধুনিক সাজে সাজিয়ে তোলা হয়েছে? কে জানে? তবে দুর্গাপুজোর প্রেমের মতো বইমেলার প্রেমও চিরস্থায়ী হয় না বোধহয়! (একটু ব্যক্তি অভিজ্ঞতা থেকেই বলি) তা না হলে ওই যে স্মার্ট পোশাক পরা, রোদ চশমাটা মাথার উপরে রাখা মেয়েটি পাশের যে সঙ্গীটির হাত ধরে ঘন হয়ে হাঁটছে, বছর দুয়েক আগে এক বইমেলাতে ওকেই দেখেছিলাম অন্য এক সঙ্গীর সঙ্গে একই কোল্ড্রিংসের বোতলের দুটো স্ট্র দিয়ে তারল্যে তলিয়ে যেতে। ওই যে পুরুষটি সঙ্গিনীর ঘামে ভেজা কপালে বেঁকে যাওয়া টিপটি স্বস্থানে ফিরিয়ে আনছে নিজের রুমাল দিয়ে, পরের বছর বইমেলায় সে যে অন্য কারোর সঙ্গে স্নানচ্যূত হবে না, তা কে বলবে নিশ্চিত করে? কিন্তু এই মুহূর্তগুলোর সাক্ষী রয়ে যাবে বইমেলা। বইমেলা হারিয়ে পাওয়ার কিংবা পেয়ে হারানোর উপলক্ষ।
বইমেলার এইসব খণ্ডচিত্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনে সবকিছুই আপেক্ষিক। শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের ক্ষেত্রেও। তা না হলে একদিন যে বাংলাদেশ ফোকাল থিম কান্ট্রি হয়েছিল সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক কারণে আজ সেই বাংলাদেশ বইমেলায় আসতে পারল না কেন? বইমেলায় বাংলাদেশের স্টলের জায়গাটা কেন জেগে রইল গ্রাউন্ড জিরোর শূণ্যতা নিয়ে? আসলে শূণ্যতাও যে কোনও মেলার ধর্ম। অবধারিতভাবে বইমেলার শূণ্যতা আসবে নয় ফেব্রুয়ারি, যেদিন আটচল্লিশতম বইমেলার শেষ বিদায় ঘন্টা বাজবে। বইয়ের পসরা গুটিয়ে বই পাড়ায় ফিরে যাবে বিক্রেতারা। চোখে জল আসবে গিল্ড সভাপতি সুধাংশুবাবুর। সজল চোখে মেলামুখো মানুষ বাড়ির দিকে পা বাড়াবে। আবার এক বছরের অপেক্ষা। শুধু বই মেলার শূন্য মাঠটা জেগে থাকবে হারানো সম্পর্ক, হারানো স্মৃতি পাহারা দিতে।
এই ইঙ্গিতটা বুঝেছিলেন কবি জয় গোস্বামী। তাই তাঁর বইমেলা কবিতায় লিখেছেন, ‘–ধান পাহারায় বসে আছে কঞ্জুস/ বইমেলা যাবে? পাখি হুস্, পাখি হুস্। কতো কতো লেখা— কত বই। যদি ছুঁস্,… পাখি হুস্, পাখি হুস্।’ বইমেলা ভালোমন্দ কত স্মৃতিকে পাহারা দেয়! বইমেলায় গিয়ে আমরা বোধহয় বইয়ের পাতায় হাত রেখে ফেলে আসা সময়কেই ছুঁয়ে দেখতে চাই, যা আমাদের মুঠো গলে বেরিয়ে যায় হুস্ করে।